চেলা নদীতে অবৈদ বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন: নদী ও ঘর-বাড়ী ভাঙ্গনের আশঙ্কা

জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, ছাতকঃ
ছাতকের চেলা নদী থেকে বোমা মেশীন দিয়ে অবাদে চলছে পাথর উত্তোলন। দেশের সর্ববৃহৎ পাথর (খনি) কোয়ারী হচ্ছে পাহাড়ী নদী চেলা ও ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি । এসব কোয়ারি এলাকা থেকে পাথর উত্তোলনের মাধ্যমে দেশের চাহিদা মিটিয়ে এখানের পাথর বিদেশেও রপ্তানী হয়ে আসছে যুগ-যুগ ধরে। পাথর উত্তোলনের মাধ্যমে কর্মসংস্থানরে সৃষ্টিও হয়ে ছিল কয়েক লক্ষ মানুষের । দল বেঁধে নারী-পুরুষ পাথর শ্রমিকরা ছুটে আসতো তাদের কর্মস্থল এসব কোযারী এলাকায়। দিনভর পাথর উত্তোলন করে রুটি রোজগার করে জীবিকা নির্বাহ করতো এখানের লক্ষ-লক্ষ শ্রমিক। পাথর ব্যবসায় অনেকটা লাভবানও হয়ে ছিলেন স্থানীয ব্যবসায়ীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এখানে আসা ব্যবসায়ীরা। কিন্তু কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে কোয়ারি এলাকার সেই চিত্র। পাহাড়ি নদী চেলা-ইছামতি-ধলাই নদীসহ ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারীতে এখন আর আগের মতো পাথর উত্তোলন হতে দেখা যায়না। বদলে গেছে চির-চেনা এসব নদ-নদীসহ ভোলাগঞ্জের পুরনো চিত্র। বর্তমানে এখানে যুগের সাথে পাল্লা দিয়ে পাথর উত্তোলনে বেশ কিছু দিন ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে ‘বোমা মেশিন’ নামক দানব যন্ত্র। সম্প্রতি দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের পূর্ব সোনাপুর মাদ্রাসা এলাকায় সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, চেলা নদীতে ৪০/৫০টি বোমা মেশিন বসিয়ে নদীর নিচ থেকে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। এখানে পাথর উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রটি মূলত একটি পাওয়ার পাম্প আর পাইপ দিয়ে তৈরি। স্থানীয় একাধিক লোক জানান, এ যন্ত্রটি যখন চালানো হয় তখন বোমা বিস্ফোরণের মতো বিকট শব্দ হয়ে থাকে। ফলে ‘বোমা মেশিন’ নাম দেওয়া হয়েছে যন্ত্রটির। স্থানীয় এসব সুত্রে আরো জানা যায় নদীর ৭০/৮০ ফুট গভীর থেকে পাথর উত্তোলন করতে সক্ষম এ যন্ত্রটি। পাথর উত্তোলনের বিষয়ে পূর্ব সোনাপুরসহ স্থানীয় একাদিক গ্রামের লোকজন অভিযোগ করে বলেন, গত ১৫/২০ দিন থেকে চেলানদীর মাঝখানে বোমা মেশিন ব্যবহার করে দেদারছে পাথর উত্তোলন করছে দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের সোনাপুর, হাবিবনগর, পূর্বসোনাপুর, লোভীয়া ও শারপিন পাড়া গ্রামের প্রভাবশালী একটি মহল। মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলনের ফলে নদী এলাকার ভূগর্ভস্থ মাটির স্তর পরিবর্তিত হয়ে নদীর ভূপ্রকৃতি, পরিবেশে বিনষ্ট, নদী ভাঙ্গন বৃদ্ধি ও আশ-পাশ এলাকার ঘর-বাড়ি নদী গর্ভে বিলিনসহ এলকার ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হওয়ার আসংখ্যা করছেন স্থানীয় বাসীন্দারা। এব্যাপারে জানতে চাইলে স্থানীয় ইউপি সদস্য জয়নাল মিয়া এর সত্যতা স্বীকার করে বলেন, চেলা নদী থেকে বোমা মেশিনে পাথর উত্তোলনের বিষয়টি আমি পার্শবর্তী সোনালী চেলা বিজিবি ক্যাম্পে জানিয়েছি। বিজিবরি নায়েক সুবেদার ফারুক সাহেব আসে দেখে গেছেন। কিন্তুু বিজিবি ক্যাম্পে টাকা দিয়েই এখানে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। তিনি জানান পূর্বসোনাপুর, মাদ্রাসা এলাকা ও সোনাপুর গ্রামের উত্তর-পূর্বকোনা এলাকা থেকে বোমামেশিন দিয়ে পাথর উত্তােলন করছে, সোনাপুর, হাবিবনগর, লোভীয়া, পূর্বসোনাপুর ও শারপিন পাড়া গ্রামের কিছু লোকজন। তিনি আরো জানান সীমান্তের ১শ’ ৫০গজ এলাকার মধ্যে পতাকা উড়িয়ে বিজিবির নিয়ন্ত্রনাধীন রাখা এলাকায় নৌকা নিয়ে প্রবেশ করে টাকার বিনিময়ে বিজিবিকে হাত করেও রাতের আধারে ছোট-বড় পাথর ও বালু উত্তোলন করা হচ্ছে । সোনালী চেলা বিজিবি ক্যাম্পের নায়েক সুবেদার ফারুক পাথর উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, এখানের কিছু লোক নদীতে মেশিন বসিয়ে পাথর উত্তালেন করছে এমন খবর পেয়ে আমি নিজে সেখানে উপস্থিত থেকে নদী থেকে পাথর উত্তোলনে ব্যবহত মেশিন গুলো উটিয়ে দিয়ে এসেছি। তবে বিজিবি ক্যাম্পে টাকা দিয়ে পাথর উত্তোল করছে এমন অভিযোগটি তিনি অস্বীকার করেছেন। নরসিংপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুর উদ্দিন এব্যাপরে বলেন, অবৈদ ভাবে নদীতে ৪০/৫০‌টি বোমা মেশিন বসিয়ে চেলা নদী থেকে পাথর উত্তোলন করছে এলাকার কিছু অসাধু ব্যবসায়ীরা। পাথর উত্তোলনের ফলে নদীর আশ-পাশ এলাকার দুই থেকে আড়াই হাজার ঘর-বাড়ি নদী ভঙ্গনের কবলে পড়েছে। পাথার উত্তোলনকারীদের তালিকা করা হচ্ছে। নাম-তালিকাসহ পাথর উত্তোলনের সাতে জড়িত ব্যক্তি‌দের বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে অভিযোগ দেয়া হবে। এদিকে ছাতক রেলওয়ে ও স্থানীয় একাধিক সুত্রে জানা যায়, এর আগে বোমা মেশিনে পাথর উত্তোলনের প্রথম ধ্বংসযজ্ঞের মুখে পড়ে ছাতক-ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি এলাকায় রেলওয়ের একমাত্র রজ্জুপথ। বাংলাদেশ রেলওয়ের কাজে ব্যবহৃত পাথর জল ও স্থল পথে পরিবহনের জন্য বিকল্প পথ হিসেবে ভোলাগঞ্জ থেকে ছাতক শহর পর্যন্ত রজ্জুপথ ১৯৬৪ সালে স্থাপন করা হয়। স্থানীয় একাধিক সুত্রে জানা যায় ধলাই নদীর তীর ঘেঁষে ২০০৮ সাল থেকে বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন করার হচ্ছে। এক পর্যায়ে রেলওয়ে মালিকানাধীন রজ্জুপথের সংরক্ষিত বাংকার এলাকায় বোমা মেশিন চালিয়ে পাথর উত্তোলন শুরু করে স্থানীয় একটি মহল। বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলনের ফলে সংরক্ষিত এলাকার ৩৫৯ একর জায়গার মধ্যে ১৪১ একর ভূমি ও রজ্জুপতের ট্রেেসল ধসের মুখে পড়। এসময় রেলওয়ে ভূমি রক্ষায় ১৪৪ধারা জারি করে নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করে রেলের কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) ২০০৯ সালে উচ্চ আদালতে এ-সংক্রান্ত একটি রিট করলে ‘বোমা মেশিন’ নিষিদ্ধ করা হয়। পাশা-পাশি পরিবেশ অধিদপ্তরসহ স্থানীয় প্রশাসনকে নিয়ে এ-সংক্রান্ত অভিযান পরিচালনা করতে নির্দেশনা জারি করা হয়। পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয় সূত্র জানা যায়, আদালতের নির্দেশনায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করে অভিযান চালানো হয়। এসব এলাকায় বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করে কয়েক শতাদিক বোমা মেশিন ধ্বংস করাও হয়েছে। কিন্তু এর পরও এসব বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন বন্ধ করা যাচ্ছে না।##

শেয়ার করুন