শিশুরা যেন বিপথে না যায়: টুঙ্গিপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘শিশুরা যেন বিপথে না যায় সে বিষয়ে অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিশেষ নজর দিতে হবে। তারা যেন জঙ্গি ও মাদকাশক্ত হয়ে না পড়ে। তারা শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিত থাকছে কী না- সে বিষয়ে শিক্ষকদের খোঁজ রাখতে বলেন প্রধানমন্ত্রী। কি কারণে তারা অনুপস্থিত সে বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের আহবান জানান প্রধানমন্ত্রী।

এছাড়াও তিনি বলেন, “শুধু শিক্ষা নয়, ধর্মীয় শিক্ষাকেও আমরা বাধ্যতামূলক করেছি। কিন্তু ধর্মান্ধতা যেন না আসে। আমাদের ধর্ম ইসলাম অত্যন্ত পবিত্র ধর্ম, শান্তির ধর্ম। এই ধর্ম কাউকে খুন করার অধিকার দেয়নি।”

জাতিরপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৮ তম জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে ১৭ মার্চ শুক্রবার বিকেলে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রনালয় আয়োজিত শিশু সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সাধারণ নিয়মের ব্যাত্যয় ঘটিয়ে এ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন শিশু প্রতিনিধি উপমা বিশ্বাস।

বিশিষ অতিথির বক্তব্য রাখেন শিশু ও মহিলা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি, শিশুদের পক্ষ থেকে শিশু ফাইয়াদ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ স্বাগত বক্তব্য প্রদান করে। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন শিশু ও মহিলা বিষয়ক সচিব নাছিমা বেগম এনডিসি, ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার মোঃ মনির হোসেন ও গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোখলেসুর রহমান সরকার।

বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, “প্রত্যেক ধর্মের মর্মবাণী হল শান্তির বানী প্রচার করা। কাজেই যে যে ধর্মই গ্রহণ করুক না কেন, সবাইকে মাথায় রাখতে হবে– যার যার ধর্ম সে সে পালন করবে। ধর্মে সব সময় শান্তি, ভাতৃত্ব, সৌহার্দ্যের কথা বলা হয়েছে। সেটা সকলকে মেনে চলতে হবে।” জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শৈশব থেকেই পরোপকারী ছিলেন জানিয়ে সমাবেশে আসা শিশুদের তা অনুসরণ করতে বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিয়ে বড় হতে হবে। দেশের মানুষকে ভালবাসতে হবে।একদিন তোমরা দেশের কর্ণধার হবে। আমার মত প্রধামন্ত্রী হতে পার। সেই আত্মবিশ্বাস নিয়ে বড় হতে হবে।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু দূরদর্শী নেতৃত্ব দিয়ে ধাপে ধাপে এ জাতিকে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। এই কাজ করতে গিয়ে জীবনে অনেক বছর তিনি কারাগারে কাটিয়েছেন, বারবার মৃত্যুর মুখে দাঁড়াতে হয়েছে তাকে। তিনি ছিলেন অদম্য সাহসী, নীতি ও লক্ষ্যে স্থির থেকে এগিয়ে গেছেন।
দাদীর কাছে শোনা বাবার কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, ছোটবেলা থেকেই মানুষকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন বঙ্গবন্ধু। বালক বয়স থেকেই তিনি মানুষের উপকারে বিভিন্ন কাজ করতেন। নিজের জামা, খাবার ও অন্যান্য ব্যবহার্য জিনিস অভাবি মানুষকে বিলিয়ে দিতেন। দুর্ভিক্ষের সময় বঙ্গবন্ধু তার বাবার গোলা থেকে ধান বিলিয়ে দিয়েছিলেন বলেও জানান শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সময় আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার বদলে তাকে দেখতে জেলখানায় যেতে হয়েছে। কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ারা সময়ও বাবার সঙ্গে জেলে দেখা করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, জাতির পিতা চেয়েছিলেন, এ দেশের প্রতিটি শিশু শিক্ষিত হবে। আমরা সেই চেষ্টা করছি। প্রত্যেকটা শিশুর মাঝে সুপ্ত প্রতিভা রয়েছে, তা বিকাশের সুযোগ করে দিচ্ছি। শিশু সমাবেশ শেষে প্রধানমন্ত্রী সুন্দর হাতের লেখা প্রতিযোগিতা, চিত্রাংকন, আবৃত্তি ও ৭ই মার্চের ভাষণ প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন। পরে শিশু ও মহিলা অধিদপ্তরের উদ্যোগে টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়া উপজেলার ১ শ’ দুস্থ মহিলাদের মাঝে সেলাই মেসিন বিতরন করেন প্রধানমন্ত্রী।

এরপর গোপালগঞ্জের শিশু শিল্পীরা “ বাঙ্গালীর পরশমণি ” শীর্ষক কাব্য নৃত্য গীতি আলেখ্য পরিবেশন করে। প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীপরিষদ সদস্যবৃন্দ, সংসদ সদস্যগণ, তিনবাহিনী প্রধানগণ, উর্ধ্বতন সামরিক বেসামরিক কর্মকর্তা ছাড়াও বিপুল সংখ্যক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও দর্শক এ অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। শিশু সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী সমাধিসৌধ কমপেক্সে জাতীয় গ্রস্থ কেন্দ্র আয়োজিত গ্রন্থ মেলার উদ্বোধন ও থোকা থেকে বঙ্গবন্ধু আলোকচিত্র প্রদর্শনী ঘুরে ঘুরে দেখেন।

বাঙ্গালী জাতির মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি জম্ম দিনের শ্রদ্ধা জানাতে সকাল ৯ টা ৫৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী টুঙ্গিপাড়া বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধে আসেন। ১০ টা কিছু পরে রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে
স্বাগত জানান।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ধীর পায়ে বঙ্গবন্ধু সমাধিসৌধের বেদীর দিকে এগিয়ে যান। সকাল ১০ টা ২৫ মিনিটে প্রথমে রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ গোটা জাতির পক্ষ থেকে স্বাধীনতার রূপকার বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদেন করেন। এরপর ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান, বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসময় সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদান করে। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী কিছুক্ষন বেদীর পাশে নিরবে দাড়িয়ে থাকার পর পবিত্র সুরা ফাতেহা পাঠ করেন। তারা বঙ্গবন্ধুর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া ও মোনাজাত করেন।

এরপর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও সাধারণ সম্পাদক সড়ক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতারা বঙ্গবন্ধু সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর সহযোগী সংগঠনসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক পেশাজীবি ও শ্রমজীবি সংগঠনের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর প্রতি জম্ম দিনের শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ সমাধি সৌধে রক্ষিত পরিদর্শন বইতে মন্তব্য লিখে স্বাক্ষর করেন।

এ অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধূরী, আওয়ামীলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বানিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহম্মেদ, এলজিইডি মন্ত্রী খোন্দকার মোশারফ হোসেন, জন প্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, স্বারাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহাজাহান খান, আওয়ামীলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য লেঃ কর্ণেল ( অবঃ) মুহাম্মদ ফারুক খান এমপি, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল হক, এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. খোন্দকার নাসির উদ্দিন, কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান সিরাজ, শেখ হেলাল উদ্দিন এমপি, আব্দুর রহমান এমপি, আ.ফ.ম বাহাউদ্দিন নাছিম এমপি, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী আব্দুস সোবহান গোলাপ, পুলিশের আই.জি শহিদুল ইসলাম, র‌্যাবের মহা পরিচালক বেনজীর আহমেদ,জাহাঙ্গীর কবির নানক, মীর্জা আজম,এসএম কামাল ,উম্মে রাজিয়া কাজল এমপি, গোপালগঞ্জ জেলা পরিষদেও চেয়ারম্যান চৌধূরী এমদাদাদুল হক, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব আলী খান, শেখ সালাহ উদ্দিন জুয়েল, উপজেলা চেয়ারম্যান শেখ লুৎফার রহমান বাচ্চু, মুজিবুর রহমান হাওলাদার, গাজী গোলাম মোস্তফা, পৌর মেয়র কাজী লিয়াকত আলী লেকু, শেখ আহমেদ হোসেন মীর্জা, এইচ এম অহিদুল ইসলাম, সাবেক পৌর মোঃ ইলিয়াস হোসেন, টুঙ্গিপাড়া উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি শেখ আব্দুল হালিম, সাধারন সম্পাদক শেখ আবুল বশার খায়ের, কোটালীপাড়া উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি এ্যাড. সুভাষ চন্দ্র জয়ধর, এস.এম হুমায়ূন কবির, গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক রফিকুল ইসলাম মিটু সহ মন্ত্রীপরিষদের সদস্যবৃন্দ, সংসদ সদস্যগণ, তিনবাহিনী প্রধানগণ, উর্ধ্বতন সামরিক বেসামরিক কর্মকর্তা ছাড়াও বিপুল সংখ্যক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।

শ্রদ্ধা নিবেদনের পর রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ টুঙ্গিপাড়া বঙ্গবন্ধু ভবনে যান। তিনি সেখানে কিছু সময় কাটানোর পর বেলা সাড়ে ১১ টার দিকে টুঙ্গিপাড়া থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। প্রধানমন্ত্রী টুঙ্গিপাড়ার বঙ্গবন্ধু ভবনে জুম্মার নামাজ আদায় করেন। বাদ জোহর টুঙ্গিপাড়া বঙ্গবন্ধু সমাধিসৌধ কমপ্লেক্স মসজিদে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। বঙ্গবন্ধু ভবনে বসেই প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু সমাধিসৌধ মসজিদে আয়োজিত মিলাদ ও দোয়া মাহফিলে অংশ নেন।

বিকেল ৫ টার দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টুঙ্গিপাড়া থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। তারপর সাধারন মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধ অবমুক্ত করে দেয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে গোপালগঞ্জসহ দেশের বিভিন্নস্থান থেকে আগত মানুষের ঢল নামে। রংবেরং এর পতাকা ও তোরন দিয়ে টুঙ্গিপাড়াকে বর্নিল সাজে সাজানো হয়।

শিশু সমাবেশের শুরুতে শুভ শুভ শুভ দিন বঙ্গবন্ধুর জম্ম দিন ধ্বনিতে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবের জম্ম ভূমি টুঙ্গিপাড়া মুখরিত হয়ে ওঠে। সর্বত্রই বিরাজ করছিল উৎসবের আমেজ। শিশু কিশোর সমাবেশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করে শিশুদের পরিবেশনা। উৎসব মুখর পরিবেশে হাজার হাজার মুজিব আদর্শের সৈনিক ফুল দিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতি জম্ম দিনের শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। জম্মদিনে বাঙ্গালীর ফুলে ও ভালবাসায় সবার শ্রেষ্ঠ বঙ্গালী স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু সিক্ত হন। প্রার্থনা সভা
গোপালগঞ্জ কেন্দ্রীয় সার্বজনীন কালিবাড়ীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জম্ম বার্ষিকী উপলক্ষে প্রর্থনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ উপলক্ষে
সেখানে বঙ্গবন্ধুর আত্মার শান্তি কামনায় বিশেষ প্রার্থনা, শাস্ত্রপাঠ, আলাচনাসভা ও ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরন করা হয়।
এ ছাড়া শহরের শেখ রাসেল শিশু পার্ক সংলগ্ন লোকনাথ মন্দিরে বঙ্গবন্ধুর জম্ম বার্ষিকী উপলক্ষে প্রর্থনা সভা, বঙ্গবন্ধুর আত্মার শান্তি কামনায়
বিশেষ প্রার্থনা, মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জ্বলন ও প্রসাদ বিতরনের আয়োজন করা হয় বলে মন্দিরের পূজারী খোকন কর্মকার জানিয়েছেন। এ ছাড়া জেলার ৫ উপজেলার প্রধান প্রধান মন্দিরে প্রার্থনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

শেয়ার করুন